কৃষ্ণার সৈকতে ক্ষুদ্র শ্যামল প্রান্তরে
বসি বৃদ্ধ বালানাথ কঁাদিছে নীরবে;
কত যে বিস্তৃত স্মৃতি হৃদয়ের তলে
উঠিছে জাগিয়া, ক্রমে মানস নয়নে
ভাসিছে নৈরাশ্যপূর্ণ বিগত জীবন।
দূরে রাখালের গান ধেনু রব সনে
মিশিয়াছে কি সুন্দর ঢালিয়া যতনে
ভাবময়ী প্রকৃতির অতৃপ্ত মরমে
অনন্ত কবিত্বপূর্ণ শান্তি-পরিমল।
অস্তোন্মুখে দিনমণি, বসুধার বুকে
পড়েছে সায়াহ্ন ছায়া, প্রকৃতি সুন্দরী
দুই বেশে সুসজ্জিত— চারু ভয়ঙ্কর।
— একদিকে স্বর্ণকান্তি, অন্য দিকে ঘোর
কৃষ্ণ বেশ প্রলয়ের পূর্ব নিদর্শন।
পশ্চিমে অতুল শোভা, সিন্দুরে মন্ডিত
নভঃস্থল পূর্ব দিক গ্রাসিছে তিমির
ধূম্রবর্ণ— একাকৃতি গগন ভুতল।
তাহে কৃষ্ণা ভয়ঙ্করী অতি দীর্ঘকায়
মিশিয়াছে সেই সনে, আরো ভয়ঙ্কর।
বালানাথ ক্ষুণ্ণ প্রাণে বসিয়া নীরবে
কত যে কঁাদিলা স্মরি অতীত জীবন
কাতরে করুণ কন্ঠে কহিলা কঁাদিয়া,
"দয়াময়, অভাগারে কেন নিরদয়?
যে নাম স্মরিয়া নাথ কত যে পতিত
লভিল উদ্ধার, হায় সে নাম স্মরিয়া
ভাসিবে কি এ অভাগা নয়নের জলে?
তুমি ত সকলি জান ওহে দয়াময়,
এ জীবনে ভ্রমেও যে করিনি কখন
পাপ পথে বিচরণ, তবু কেন নাথ,
অভাগার শিরে হেন অশনি সম্পাত?
জীবনের ধ্রুবতারা, নয়নের মণি
স্নেহের দুহিতা সেই হিরণ আমার
শৈশবেই মাতৃহীনা, কত যে যন্ত্রণা
ভুগিয়াছে অভাগিনী শৈশব জীবনে
মাতৃ অনুরোধে তার মারাঠা গুরুর
যোগাশ্রমে, শৈশবেই দিয়াছিনু সঁপে
ভৈরবীর হাতে তারে, ভ্মব্রহ্মচর্য ব্রত
দিতে শিক্ষা, সেই হতে আছে সে সেখানে।
স্নেহের লবঙ্গলতা ভগিনেয়ী মম
ত্যাজিয়াছে প্রাণ এই তটিনীর জলে?
দুঃখিনী জননী তার প্রতি অত্যাচারে
রোষে ক্ষোভে আত্মহত্যা করিয়াছে হায়
কঁাদাইতে বৃদ্ধ কালে এই অভাগারে।
কি কুক্ষণে অলকারে দেখিয়া রঘুজী
ভুলেছিল রূপে তার, পতঙ্গের মত্
ঝম্প দিয়া রাক্ষসীর গুপ্ত প্রেমানলে
মজিল আপনি, হায় মজাল সংসার।
হতভাগ্য না মজিলে অলকার প্রেমে
মরিত কি ভার্যা তার? তটিনীর জলে
মরিত কি মাতৃহীনা লবঙ্গ আমার?
এত জ্বালা দয়াময় সহিব কেমনে?
নিরুদ্দেশ এক মাত্র জ্যেষ্ঠ সহোদর
শান্তজী, কে জানে আজ মৃত কি জীবিত?
দীনা হীনা ভার্যা তার পুত্রকন্যা সনে
স্বামীর বিচ্ছেদে, গেলা তীর্থ পর্যটনে
ভগ্ন হৃদে, এ জনমে ফিরিল না আর।
অভাগার একমাত্র পুত্র প্রিয়তম
শম্ভুজী, অদৃষ্ট দোষে সেও নিরুদ্দেশ
সেই সনে, বঁেচে আর আছে কি জীবনে?
কত দেশ, কত তীর্থ কাননে প্রান্তরে
কত লোক পাঠাইনু, এ জীবনে হায়,
কোন স্থান কোন তত্ত্ব মিলিল না আর
রোগে শোকে ক্লিষ্ট আমি, এ ভুজ দুর্বল
কেমনে ধরিব অসি এ মহা সমরে?
পুত্র ভার্যা শোকে আমি উন্মাদের প্রায়,
কে বোঝে তা? সকলেই সমর উল্লাসে
উল্লসিত, সুসজ্জিত সংগ্রামের তরে।
শান্তি যে কি, মহারত্ন মানব জীবন
কেমনে বুঝিবে তাহা মোস্লেম বর্বর?
তাহারাই এ ভারতে অনর্থের মূল
সসৈন্যে প্রেরিত দত্ত মোস্লেম সংগ্রামে
কে জানে কি আছে ভাগ্যে জয় পরাজয়?"
বৃদ্ধের হৃদয়ে জল বুদ্বুদের মত
কত কথা কত ভাব উঠিছে মিশিছে
পলে, পলে, হৃদয়ে অশান্তি বশতঃ
জাগিয়াও বৃদ্ধ যেন দেখিছে স্বপন;—
একটি সুবর্ণ রথে করি আরোহণ
বহু দূর, শূন্য পথে ত্রিদিবের দ্বারে
উপনীত, পাপপূর্ণ সংসারের মত
নাহি সেথা কোলাহল যন্ত্রণা ভীষণ?
হেন কালে মাঝি এক বসিয়া আনন্দে
অদূরে সৈকত পার্শ্বে তরণীর’পরে
গাইল সংগীত এক অতি সুমধুর—
দে জল দে জল বলি, কেনরে কঁাদিস তুই
ওরে বোকা পাখি।
কে তোরে দিবেরে জল এ যে মহামরু-স্থল,
এখানে সকলি হায় ফঁাকি।
ভাঙ্গিল বৃদ্ধের মোহ শুনিলা নীরবে
সে সুধা-সঙ্গীত সুরে করিয়া কম্পিত
নৈশ প্রকৃতিরে, মাঝি গাইছে উল্লাসে।
দে জল দে জল বলি, কেনরে কঁাদিস তুই
ওরে বোকা পাখি।
কে তোরে দিবেরে জল, এ যে মহামরু-স্থল,
এখানে সকলি হায় ফঁাকি।
ওরে বোকা পাখি।
কি সুধা ঢালিস্ তুই ও করুণ স্বরে।
কি যেন হারানো কথা, প্রাণের লুকানো ব্যথা,
জেগে উঠে আমার অন্তরে।
পাখিরে!—
শুনিলে সে শোকগাথা, প্রাণে উঠে কত কথা,
তুই কি বুঝিবি পাখি
এ হৃদি যা করে?
পাখিরে!
বনের বিহগ তুই,
থাকিস্ সতত ঘোর বনে।
তুই কি বুঝিবি পাখি, কত দুঃখ কত ব্যথা
আমার এ মনে?
পাখিরে!—
আমারি মতই তুই আশাভগ্নে, অর্ধমৃত প্রায়।
আমারি মতন তুই, গৃহত্যাগী বনবাসী হায়!
আমারি মতন তোর, কেঁদে কেঁদে গেল দুটি আঁখি,
তাই কি আকুল প্রাণে, লুকায়ে বিজন বনে,
কঁাদিস্ সতত তুই পাখি।
পাখিরে!—
আপন বলিতে তোর, বুঝি এ ধরণী তলে,
নাই আর কেহ!
ভিজিলে বৃষ্টির জলে, সূের্যর কিরণ তলে,
মাথাটি রাখিতে নাহি গেহ!
দে জল দে জল বলি, তাই কঁাদিস তুই
আকুল পরাণে!
কে তোরে দিবেরে জল, এ যে মহামরু-স্থল,
জল তুই পাইবি কেমনে?
সঙ্গীতের প্রতি শব্দে, প্রত্যেক উচ্ছ্বাসে
ঝরিতে লাগিল যেন মুক্তা রাশি রাশি
আঁধার তটিনী গর্ভে সৈকত প্রান্তরে,
নৈশ প্রকৃতির মুগ্ধ অতৃপ্ত হৃদয়ে।
নীরবে সে বালানাথ বসিয়া সৈকতে
দেখিলা কৃষ্ণার জলে নৈশ অন্ধকারে
নিস্তব্ধ তরণী’পরে অসংখ্য প্রদীপ
জ্বলিতেছে, প্রতিবিম্ব সলিল দর্পণে
শোভিছে কি মনোহর স্বর্ণ-রেখা প্রায়
সারি সারি, কেঁপে কেঁপে হিল্লোলে হিল্লোলে।