নিরীহ কলম, নিরীহ কালি,
নিরীহ কাগজে লিখিল গালি—
‘বাঁদর, বেকুব, আজব হাঁদা,
বকাট ফাজিল, অকাট গাধা!’
আবার লিখিল কলম ধরি
বচন মিষ্টি, যতন করি—
‘শান্ত, মানিক, শিষ্ট, সাধু,
বাছা রে, ধন রে, লক্ষ্মী, যাদু।’
মনের কথাটি ছিল যে মনে,
রটিয়া উঠিল খাতার কোণে,
আঁচড়ে আঁকিতে আখর ক’টি,
কেহ খুশি, কেহ উঠিল চটি!
রকম‐রকম কালির টানে
কারো হাসি কারো অশ্রু আনে,
মারে না, ধরে না, হাঁকে না বুলি,
লোকে হাসে কাঁদে কি দেখি ভুলি?
সাদায় কালোয় কি খেলা জানে?
ভাবিয়া ভাবিয়া না পাই মানে॥
সন্দেশ---১৩২৬
কাগজ কলম লয়ে বসিয়াছি সদ্য,
আষাঢ়ে লিখিতে হবে বরষার পদ্য।
কি যে লিখি কি যে লিখি ভাবিয়া না পাই রে,
হতাশে বসিয়া তাই চেয়ে থাকি বাইরে।
সারাদিন ঘনঘটা কালো মেঘ আকাশে,
ভিজে ভিজে পৃথিবীর মুখখানা ফ্যাকাশে।
বিনা কাজে ঘরে বাঁধা কেটে যায় বেলাটা,
মাটি হল ছেলেদের ফুটবল খেলাটা।
আপিসের বাবুদের মুখে নাই ফুর্তি,
ছাতা কাঁধে জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি।
কোনখানে হাঁটুজল, কোথা ঘন কর্দম—
চলিতে পিছল পথে পড়ে লোক হর্দম।
ব্যাঙেদের মহাসভা আহ্লাদে গদ্গদ্,
গান করে সারারাত অতিশয় বদ্খদ।
মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার,
সবাই বলে ‘মিথ্যে বাজে বকিস নে আর খবরদার!’
অমনধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব?
বলবে সবাই, ‘মুখ্যু ছেলে’, বলবে আমায় ‘গো‐গর্দভ’।
কেউ কি জানে দিনের বেলায় কোথায় পালায় ঘুমের ঘোর?
বর্ষা হলেই ব্যাঙের গলায় কোত্থেকে হয় এমন জোর?
গাধার কেন শিং থাকে না? হাতির কেন পালক নেই?
গরম তেলে ফোড়ন দিলে লাফায় কেন তা ধেই‐ধেই?
সোডার বোতল খুল্লে কেন ফসফসিয়ে রাগ করে?
কেমন করে রাখবে টিকি মাথায় যাদের টাক পড়ে?
ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয়?
মাথায় যাদের গোল বেধেছে তাদের কেন ‘পাগোল’ কয়?
কতই ভাবি এ‐সব কথা, জবাব দেবার মানুষ কই?
বয়স হলে কেতাব খুলে জানতে পাব সমস্তই।
সন্দেশ---১৩২৯
ছুটি! ছুটি! ছুটি!
মনের খুশি রয় না মনে, হেসেই লুটোপুটি।
ঘুচলো এবার পড়ার তাড়া, অঙ্ক কাটাকুটি,
দেখব না আর পণ্ডিতের ওই রক্ত আঁখিদুটি।
আর যাব না স্কুলের পানে নিত্য গুটি গুটি,
এখন থেকে কেবল খেলা, কেবল ছুটোছুটি।
পাড়ার লোকের ঘুম ভাঙিয়ে আয় রে সবাই জুটি,
গ্রীষ্মকালের দুপুর রোদে গাছের ডালে উঠি।
আয় রে সবাই হল্লা করে হরেক মজা লুটি,
একদিন নয়, দুইদিন নয়, দুই দুই মাস ছুটি!
সন্দেশ--- ১৩২২
চুপ কর্ শোন্ শোন্, বেয়াকুফ হোস্ নে
ঠেকে গেছি বাপ্ রে কি ভয়ানক প্রশ্নে!
ভেবে ভেবে লিখে লিখে বসে বসে দাঁড়েতে
ঝিম্ঝিম্ টন্টন্ ব্যথা করে হাড়েতে।
এক ছিল দাঁড়ি মাঝি— দাড়ি তার মস্ত,
দাড়ি দিয়ে দাঁড়ি তার দাঁড়ে খালি ঘষ্ত।
সেই দাঁড়ে একদিন দাঁড়কাক দাঁড়াল,
কাঁকড়ার দাঁড়া দিয়ে দাঁড়ি তারে তাড়াল।
কাক বলে রেগেমেগে, “বাড়াবাড়ি ঐতো!
না দাঁড়াই দাঁড়ে তবু দাঁঁড়কাক হই তো?
ভারি তোর দাঁড়িগিরি, শোন্ বলি তবে রে—
দাঁড় বিনা তুই ব্যাটা দাঁড়ি হোস্ কবে রে?
পাখা হলে ‘পাখি’ হয় ব্যাকরণ বিশেষে—
কাঁকড়ার দাঁড়া আছে, দাঁড়ি নয় কিসে সে?
দ্বারে বসে দারোয়ান, তারে যদি ‘দ্বারী’ কয়,
দাঁড়ে‐বসা যত পাখি সব তবে দাঁড়ি হয়!
দূর দূর! ছাই দাঁড়ি! দাড়ি নিয়ে পাড়ি দে!”
দাঁড়ি বলে, “বাস্ বাস্! ঐখেনে দাঁড়ি দে।”
সন্দেশ--- আষাঢ়, ১৩২৭
দেখছে খোকা পঞ্জিকাতে এই বছরে কখন কবে
ছুটির কত খবর লেখে, কিসের ছুটি কদিন হবে।
ঈদ, মহরম, দোল, দেওয়ালি, বড়দিন আর বর্ষশেষে—
ভাবছে যত ফুল্লমুখে, ফুর্তিভরে ফেলছে হেসে।
এমন কালে নীল আকাশে হঠাৎ খ্যাপা মেঘের মতো,
উথলে ছোটে কান্নাধারা ডুবিয়ে তাহার হর্ষ যত।
‘কি হল তোর?’ সবাই বলে, ‘কলমটা কি বিঁধল হাতে?’
‘জিভে কি তোর দাঁত বসালি?’ ‘কামড়ালো কি ছারপোকাতে?’
প্রশ্ন শুনে কান্না চড়ে, অশ্রু ঝরে দ্বিগুণ বেগে,
পঞ্জিকাটি আছড়ে ফেলে বল্লে কেঁদে আগুন রেগে—
‘ঈদ পড়েছে জষ্ঠিমাসে গ্রীষ্মে যখন থাকেই ছুটি,
বর্ষশেষ আর দোল তো দেখি রোববারেতেই পড়লো দুটি।
দিনগুলোকে করলে মাটি মিথ্যে পাজি পঞ্জিকাতে—
মুখ ধোব না, ভাত খাব না, ঘুম যাব না আজকে রাতে।’
সন্দেশ--- ১৩২৬
খাই খাই করো কেন, এসো বসো আহারে—
খাওয়াব আজব খাওয়া, ভোজ কয় যাহারে।
যত কিছু খাওয়া লেখে বাঙালির ভাষাতে,
জড় করে আনি সব— থাক সেই আশাতে।
ডাল ভাত তরকারি ফল‐মূল শস্য,
আমিষ ও নিরামিষ, চর্ব্য ও চোষ্য,
রুটি লুচি, ভাজাভুজি, টক ঝাল মিষ্টি,
ময়রা ও পাচকের যত কিছু সৃষ্টি,
আর যাহা খায় লোকে স্বদেশে ও বিদেশে—
খুঁজে পেতে আনি খেতে— নয় বড়ো সিধে সে!
জল খায়, দুধ খায়, খায় যত পানীয়,
জ্যাঠাছেলে বিড়ি খায়, কান ধরে টানিয়ো।
ফল বিনা চিঁড়ে দৈ, ফলাহার হয় তা,
জলযোগে জল খাওয়া শুধু জল নয় তা।
ব্যাঙ খায় ফরাসিরা (খেতে নয় মন্দ),
বার্মার ‘ঙাপ্পি’তে বাপ্ রে কি গন্ধ!
মান্দ্রাজী ঝাল খেলে জ্বলে যায় কণ্ঠ,
জাপানেতে খায় নাকি ফড়িঙের ঘণ্ট!
আরশুলা মুখে দিয়ে সুখে খায় চীনারা,
কত কি যে খায় লোকে নাহি তার কিনারা।
দেখে শুনে চেয়ে খাও, যেটা চায় রসনা;
তা না হলে কলা খাও— চটো কেন? বসো না—
সবে হল খাওয়া শুরু, শোনো শোনো আরো খায়—
সুদ খায় মহাজনে, ঘুষ খায় দারোগায়।
বাবু যান হাওয়া খেতে চড়ে জুড়ি‐গাড়িতে,
খাসা দেখ ‘খাপ্ খায়’ চাপ্কানে দাড়িতে।
তেলে জলে ‘মিশ খায়’, শুনেছ তা কেও কি?
যুদ্ধে যে গুলি খায় গুলিখোর সেও কি?
ডিঙি চড়ে স্রোতে প’ড়ে পাক খায় জেলেরা,
ভয় পেয়ে খাবি খায় পাঠশালে ছেলেরা;
বেত খেয়ে কাঁদে কেউ, কেউ শুধু গালি খায়,
কেউ খায় থতমত— তাও লিখি তালিকায়।
ভিখারিটা তাড়া খায়, ভিখ্ নাহি পায় রে—
‘দিন আনে দিন খায়’ কত লোক হায় রে।
হোঁচটের চোট্ খেয়ে খোকা ধরে কান্না
মা বলেন চুমু খেয়ে, ‘সেরে গেছে, আর না।’
ধমক বকুনি খেয়ে নয় যারা বাধ্য
কিলচড় লাথি ঘুঁষি হয় তার খাদ্য।
জুতো খায় গুঁতো খায়, চাবুক যে খায় রে,
তবু যদি নুন খায় সেও গুণ গায় রে।
গরমে বাতাস খাই, শীতে খাই হিম্সিম্,
পিছলে আছাড় খেয়ে মাথা করে ঝিম্ঝিম্।
কত যে মোচড় খায় বেহালার কানটা,
কানমলা খেলে তবে খোলে তার গানটা।
টোল খায় ঘটি বাটি, দোল খায় খোকারা,
ঘাব্ড়িয়ে ঘোল খায় পদে পদে বোকারা।
আকাশেতে কাৎ হ’য়ে গোঁৎ খায় ঘুড়িটা,
পালোয়ান খায় দেখ ডিগ্বাজি কুড়িটা।
ফুটবলে ঠেলা খাই, ভিড়ে খাই ধাক্কা,
কাশীতে প্রসাদ খেয়ে সাধু হই পাক্কা।
কথা শোনো, মাথা খাও, রোদ্দুরে যেও না—
আর যাহা খাও বাপু বিষমটি খেয়ো না।
‘ফেল্’ ক’রে মুখ খেয়ে কেঁদেছিলে সেবারে,
আদা‐নুন খেয়ে লাগো পাশ করো এবারে।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ো নাকো; যেয়ো নাকো ভড়্কে,
খাওয়াদাওয়া শেষ হলে বসে খাও খড়্কে।
এত খেয়ে তবু যদি নাহি ওঠে মনটা—
খাও তবে কচুপোড়া খাও তবে ঘণ্টা।
সন্দেশ--- কার্তিক, ১৩২৪
বসি বছরের পয়লা তারিখে
মনের খাতায় রাখিলাম লিখে—
‘সহজে উদরে ঢুকিবে যেটুক,
সেইটুকু খাব, হব না পেটুক।’
মাস দুই যেতে খাতা খুলে দেখি,
এরি মাঝে মন লিখিয়াছে এ কি!
লিখিয়াছে, ‘যদি নেমন্তন্নে
কেঁদে ওঠে প্রাণ লুচির জন্যে,
উচিত কি হবে কাঁদানো তাহারে?
কিংবা যখন বিপুল আহারে,
তেড়ে দেয় পাতে পোলাও কালিয়া
পায়েস অথবা রাবড়ি ঢালিয়া—
তখন কি করি, আমি নিরুপায়!
তাড়াতে না পারি, বলি আয়, আয়,
ঢুকে আয় মুখে দুয়ার ঠেলিয়া
উদার রয়েছি উদর মেলিয়া!’
সন্দেশ--- ১৩২৬
ফিরল সবাই ইস্কুলেতে সাঙ্গ হল ছুটি—
আবার চলে বই বগলে সবাই গুটি গুটি।
পড়ার পরে কার কি রকম মনটি ছিল এবার,
সময় এল এখন তারই হিসেবখানা দেবার।
কেউ পড়েছেন পড়ার পুঁথি, কেউ পড়েছেন গল্প,
কেউ পড়েছেন হদ্দমতন, কেউ পড়েছেন অল্প।
কেউ‐বা তেড়ে গড়গড়িয়ে মুখস্থ কয় ঝাড়া,
কেউ‐বা কেবল কাঁচুমাচু মোটে না দেয় সাড়া।
গুরুমশাই এসেই ক্লাসে বলেন, ‘ওরে গদাই,
এবার কিছু পড়লি? নাকি খেলতি কেবল সদাই?’
গদাই ভয়ে চোখ পাকিয়ে ঘাবড়ে গিয়ে শেষে
বল্লে, ‘এবার পড়ার ঠেলা বেজায় সর্বনেশে—
মামার বাড়ি যেম্নি যাওয়া অম্নি গাছে চড়া,
এক্কেবারে অম্নি ধপাস্— পড়ার মতো পড়া!’
সন্দেশ--- ১৩২৩
‘পরি’পূর্বক ‘বিষ’ধাতু তাহে ‘অনট্’ ব’সে
তবে ঘটায় পরিবেষণ, লেখে অমরকোষে।
—অর্থাৎ ভোজের ভাণ্ড হাতে লয়ে মেলা
ডেলা ডেলা ভাগ করি পাতে পাতে ফেলা।
এই দিকে এসো তবে লয়ে ভোজভাণ্ড
সমুখে চাহিয়া দেখ কি ভীষণ কাণ্ড!
কেহ কহে “দৈ আনো” কেহ হাঁকে “লুচি”
কেহ কাঁদে শূন্য মুখে পাতখানি মুছি।
কোথা দেখি দুই প্রভু পাত্র লয়ে হাতে
হাতাহাতি গুঁতাগুঁতি দ্বন্দরণে মাতে।
কেবা শোনে কার কথা সকলেই কর্তা—
অনাহারে কতধারে হল প্রাণ হত্যা।
কোনো প্রভু হস্তিদেহ ভুঁড়িখানা ভারী
উর্ধ্ব হতে থপ্ করি খাদ্য দেন্ ছাড়ি।
কোনো চাচা অন্ধপ্রায় (‘মাইনাস কুড়ি’)
ছড়ায় ছোলার ডাল পথঘাট জুড়ি।
মাতব্বর বৃদ্ধ যায় মুদি চক্ষু দুটি,
“কারো কিছু চাই” বলি তড়্ বড়্ ছুটি—
সহসা ডালের পাঁকে পদার্পণ মাত্রে
হুড়্ মুড়্ পড়ে কার নিরামিষ পাত্রে।
বীরোচিত ধীর পদে এসো দেখি ত্রস্তে—
ঐ দিকে খালি পাত, চল হাঁড়ি হস্তে।
তবে দেখো, খাদ্য দিতে অতিথির থালে
দৈবাৎ না ঢোকে কভু যেন নিজ গালে!
ছুটো নাকো ওরকম মিছে খালি হাতে
দিয়ো না মাছের মুড়া নিরামিষ পাতে।
অযথা আক্রোশে কিম্বা অন্যায় আদরে
ঢেলো না অম্বল কারো নূতন চাদরে।
বোকাবৎ দন্তপাটি করিয়া বাহির
কোরো না অকারণে কৃতিত্ব জাহির।
সন্দেশ--- আষাঢ়, ১৩২৬