পুনশ্চ

সূচীপত্র

ভূমিকা

গীতাঞ্জলির গানগুলি ইংরেজি গদ্যে অনুবাদ করেছিলেম। এই অনুবাদ কাব্যশ্রেণীতে গণ্য হয়েছে। সেই অবধি আমার মনে এই প্রশ্ন ছিল যে, পদ্যছন্দের সুস্পষ্ট ঝংকার না রেখে ইংরেজিরই মতো বাংলা গদ্যে কবিতার রস দেওয়া যায় কি না। মনে আছে সত্যেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেম। তিনি স্বীকার করেছিলেন, কিন্তু চেষ্টা করেন নি। তখন আমি নিজেই পরীক্ষা করেছি, ‘লিপিকা’র অল্প কয়েকটি লেখায় সেগুলি আছে। ছাপবার সময় বাক্যগুলিকে পদ্যের মতো খণ্ডিত করা হয় নি, বোধ করি ভীরুতাই তার কারণ।

তার পরে আমার অনুরোধক্রমে একবার অবনীন্দ্রনাথ এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আমার মত এই যে, তাঁর লেখাগুলি কাব্যের সীমার মধ্যে এসেছিল, কেবল ভাষাবাহুল্যের জন্যে তাতে পরিমাণ রক্ষা হয় নি। আর-একবার আমি সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছি।

এই উপলক্ষে একটা কথা বলবার আছে। গদ্যকাব্যে অতিনিরূপিত ছন্দের বন্ধন ভাঙাই যথেষ্ট নয়, পদ্যকাব্যে ভাষায় ও প্রকাশরীতিতে যে একটি সসজ্জ সলজ্জ অবগুণ্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীন ক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেক দূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব, এই আমার বিশ্বাস এবং সেই দিকে লক্ষ রেখে এই গ্রন্থে প্রকাশিত কবিতাগুলি লিখেছি। এর মধ্যে কয়েকটি কবিতা আছে তাতে মিল নেই, পদ্যছন্দ আছে, কিন্তু পদ্যের বিশেষ ভাষারীতি ত্যাগ করবার চেষ্টা করেছি। যেমন, তরে, সনে, মোর, প্রভৃতি যে-সকল শব্দ গদ্যে ব্যবহার হয় না সেগুলিকে এই-সকল কবিতায় স্থান দিই নি।

                  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

২ আশ্বিন ১৩৩৯

কোপাই

পদ্মা কোথায় চলেছে দূর আকাশের তলায়,
     মনে মনে দেখি তাকে।
এক পারে বালুর চর,
      নির্ভীক কেননা নিঃস্ব, নিরাসক্ত—
অন্য পারে বাঁশবন, আমবন,
      পুরোনো বট, পোড়ো ভিটে,
অনেক দিনের গুঁড়ি‐মোটা কাঁঠালগাছ—
      পুকুরের ধারে সর্ষেক্ষেত,
          পথের ধারে বেতের জঙ্গল,
দেড়শো বছর আগেকার নীলকুঠির ভাঙা ভিত,
   তার বাগানে দীর্ঘ ঝাউগাছে দিনরাত মর্মরধ্বনি।
ঐখানে রাজবংশীদের পাড়া,
  ফাটল‐ধরা ক্ষেতে ওদের ছাগল চরে,
     হাটের কাছে টিনের‐ছাদ‐ওয়ালা গঞ্জ—
        সমস্ত গ্রাম নির্মম নদীর ভয়ে কম্পান্বিত।

     পুরাণে প্রসিদ্ধ এই নদীর নাম,
               মন্দাকিনীর প্রবাহ ওর নাড়ীতে।
ও স্বতন্ত্র। লোকালয়ের পাশ দিয়ে চলে যায়—
          তাদের সহ্য করে, স্বীকার করে না।
      বিশুদ্ধ তার আভিজাতিক ছন্দে
এক দিকে নির্জন পর্বতের স্মৃতি, আর‐এক দিকে নিঃসঙ্গ 
                                     সমুদ্রের আহ্বান।

একদিন ছিলেম ওরই চরের ঘাটে,
    নিভৃতে, সবার হতে বহু দূরে।
        ভোরের শুকতারাকে দেখে জেগেছি,
    ঘুমিয়েছি রাতে সপ্তর্ষির দৃষ্টির সম্মুখে
               নৌকার ছাদের উপর।
    আমার একলা দিন‐রাতের নানা ভাবনার ধারে ধারে
               চলে গেছে ওর উদাসীন ধারা—
            পথিক যেমন চলে যায়
       গৃহস্থের সুখদুঃখের পাশ দিয়ে অথচ দূর দিয়ে।

তার পরে যৌবনের শেষে এসেছি
       তরুবিরল এই মাঠের প্রান্তে।
     ছায়াবৃত সাঁওতাল‐পাড়ার পুঞ্জিত সবুজ দেখা যায় অদূরে।
 

                   এখানে আমার প্রতিবেশিনী কোপাই নদী।
                     প্রাচীন গোত্রের গরিমা নেই তার।
                   অনার্য তার নামখানি
                     কতকালের সাঁওতাল নারীর হাস্যমুখর
                       কলভাষার সঙ্গে জড়িত।
                          গ্রামের সঙ্গে তার গলাগলি,
                       স্থলের সঙ্গে জলের নেই বিরোধ।
                তার এ পারের সঙ্গে ও পারের কথা চলে সহজে।
    শনের খেতে ফুল ধরেছে একেবারে তার গায়ে গায়ে,
                   জেগে উঠেছে কচি কচি ধানের চারা।
    রাস্তা যেখানে থেমেছে তীরে এসে
                  সেখানে ও পথিককে দেয় পথ ছেড়ে—
                কলকল স্ফটিকস্বচ্ছ স্রোতের উপর দিয়ে।
    অদূরে তালগাছ উঠেছে মাঠের মধ্যে,
                  তীরে আম জাম আমলকীর ঘেঁষাঘেঁষি।

                  ওর ভাষা গৃহস্থপাড়ার ভাষা—
                           তাকে সাধুভাষা বলে না।
                     জল স্থল বাঁধা পড়েছে ওর ছন্দে,
                  রেষারেষি নেই তরলে শ্যামলে।
                     ছিপ্‌‍ছিপে ওর দেহটি
                       বেঁকে বেঁকে চলে ছায়ায় আলোয়
                          হাততালি দিয়ে সহজ নাচে।
                  বর্ষায় ওর অঙ্গে অঙ্গে লাগে মাৎলামি
                       মহুয়া‐মাতাল গাঁয়ের মেয়ের মতো—
                              ভাঙে না, ডোবায় না,
                       ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আবর্তের ঘাঘরা
                              দুই তীরকে ঠেলা দিয়ে দিয়ে
                                   উচ্চ হেসে ধেয়ে চলে।

           শরতের শেষে স্বচ্ছ হয়ে আসে জল,
                      ক্ষীণ হয় তার ধারা,
                  তলার বালি চোখে পড়ে,
           তখন শীর্ণ সমারোহের পাণ্ডুরতা
                  তাকে তো লজ্জা দিতে পারে না।
       তার ধন নয় উদ্ধত, তার দৈন্য নয় মলিন,
                   এ দুইয়েই তার শোভা;
যেমন নটী যখন অলংকারের ঝংকার দিয়ে নাচে
       আর যখন সে নীরবে বসে থাকে ক্লান্ত হয়ে—
                   চোখের চাহনিতে আলস্য,
          একটুখানি হাসির আভাস ঠোঁটের কোণে।
 

কোপাই, আজ কবির ছন্দকে আপন সাথি ক’রে নিলে,
    সেই ছন্দের আপোষ হয়ে গেল ভাষার স্থলে জলে—
       যেখানে ভাষার গান আর যেখানে ভাষার গৃহস্থালি।
তার ভাঙা তালে হেঁটে চলে যাবে ধনুক হাতে সাঁওতাল ছেলে;
           পার হয়ে যাবে গোরুর গাড়ি
               আঁঠি আঁঠি খড় বোঝাই ক’রে;
        হাটে যাবে কুমোর
           বাঁকে ক’রে হাঁড়ি নিয়ে;
     পিছন পিছন যাবে গাঁয়ের কুকুরটা;
              আর, মাসিক তিন টাকা মাইনের গুরু
                      ছেঁড়া ছাতি মাথায়।
     

১ ভাদ্র ১৩৩৯

নাটক

          নাটক লিখেছি একটি।
                  বিষয়টা কী বলি।
 
অর্জুন গিয়েছেন স্বর্গে,
        ইন্দ্রের অতিথি তিনি নন্দনবনে।
উর্বশী গেলেন মন্দারের মালা হাতে
        তাঁকে বরণ করবেন ব’লে।
অর্জুন বললেন, “দেবী, তুমি দেবলোকবাসিনী,
      অতিসম্পূর্ণ তোমার মহিমা,
          অনিন্দিত তোমার মাধুরী,
              প্রণতি করি তোমাকে।
          তোমার মালা দেবতার সেবার জন্যে।”

উর্বশী বললেন, “কোনো অভাব নেই দেবলোকের,
           নেই তার পিপাসা।
        সে জানেই না চাইতে,
    তবে কেন আমি হলেম সুন্দর!
           তার মধ্যে মন্দ নেই,
        তবে ভালো হওয়া কার জন্যে!
আমার মালার মূল্য নেই তার গলায়।
    মর্তকে প্রয়োজন আমার,
        আমাকে প্রয়োজন মর্তের।
           তাই এসেছি তোমার কাছে,
      তোমার আকাঙ্ক্ষা দিয়ে করো আমাকে বরণ,
           দেবলোকের দুর্লভ সেই আকাঙ্ক্ষা
      মর্তের সেই অমৃত‐অশ্রুর ধারা।”
 

        ভালো হয়েছে আমার লেখা।
‘ভালো হয়েছে’ কথাটা কেটে দেব কি চিঠি থেকে?
        কেন, দোষ হয়েছে কী?
    সত্য কথাই বেরিয়েছে কলমের মুখে।
        আশ্চর্য হয়েছ আমার অবিনয়ে,
      বলছ, “ভালো যে হয়েইছে জানলে কী ক’রে?”
   আমার উত্তর এই, নিশ্চিত নাই বা জানলেম।
এক কালের ভালোটা
      হয়তো হবে না অন্য কালের ভালো।
   তাই তো এক নিশ্বাসে বলতে পারি
             ‘ভালো হয়েছে’।
   চিরকালের সত্য নিয়ে কথা হত যদি
             চুপ করে থাকতেম ভয়ে।
      কত লিখেছি কতদিন,
             মনে মনে বলেছি ‘খুব ভালো’।
    আজ পরম শত্রুর নামে
         পারতেম যদি সেগুলো চালাতে
              খুশি হতেম তবে।
         এ লেখারও একদিন হয়তো হবে সেই দশা—
             সেইজন্যেই, দোহাই তোমার,
    অসংকোচে বলতে দাও আজকের মতো—
              এ লেখা হয়েছে ভালো।
 
       এইখানটায় একটুখানি তন্দ্রা এল।
হঠাৎ‐বর্ষণে চারি দিক থেকে ঘোলা জলের ধারা
      যেমন নেমে আসে, সেইরকমটা।
তবু ঝেঁকে ঝেঁকে উঠে টলমল ক’রে কলম চলছে,
     যেমনটা হয় মদ খেয়ে নাচতে গেলে।
           তবু শেষ করব এ চিঠি,
     কুয়াশার ভিতর দিয়েও জাহাজ যেমন চলে,
                কল বন্ধ করে না।
 
বিষয়টা হচ্ছে আমার নাটক।
      বন্ধুদের ফর্মাশ, ভাষা হওয়া চাই অমিত্রাক্ষর।
             আমি লিখেছি গদ্যে।
      পদ্য হল সমুদ্র,
           সাহিত্যের আদিযুগের সৃষ্টি।
                তার বৈচিত্র্য ছন্দতরঙ্গে,
                     কলকল্লোলে!
গদ্য এল অনেক পরে।
     বাঁধা ছন্দের বাইরে জমালো আসর।
          সুশ্রী‐কুশ্রী ভালো‐মন্দ তার আঙিনায় এল
                         ঠেলাঠেলি করে।
          ছেঁড়া কাঁথা আর শাল‐দোশালা
                 এল জড়িয়ে মিশিয়ে।
      সুরে বেসুরে ঝনাঝন্ ঝংকার লাগিয়ে দিল।
গর্জনে ও গানে, তাণ্ডবে ও তরল তালে
      আকাশে উঠে পড়ল গদ্যবাণীর মহাদেশ।
                কখনো ছাড়লে অগ্নিনিশ্বাস,
            কখনো ঝরালে জলপ্রপাত।
কোথাও তার সমতল, কোথাও অসমতল;
      কোথাও দুর্গম অরণ্য, কোথাও মরুভূমি।
একে অধিকার যে করবে তার চাই রাজপ্রতাপ;
      পতন বাঁচিয়ে শিখতে হবে
            এর নানারকম গতি অবগতি।
বাইরে থেকে এ ভাসিয়ে দেয় না স্রোতের বেগে,
        অন্তরে জাগাতে হয় ছন্দ
           গুরু লঘু নানা ভঙ্গিতে।
সেই গদ্যে লিখেছি আমার নাটক,
        এতে চিরকালের স্তব্ধতা আছে
               আর চলতি কালের চাঞ্চল্য।
     

৯ ভাদ্র ১৩৩৯

নূতন কাল

        আমাদের কালে গোষ্ঠে যখন সাঙ্গ হল
             সকালবেলার প্রথম দোহন,
        ভোরবেলাকার ব্যাপারিরা
             চুকিয়ে দিয়ে গেল প্রথম কেনাবেচা,
        তখন কাঁচা রৌদ্রে বেরিয়েছি রাস্তায়,
             ঝুড়ি হাতে হেঁকেছি আমার কাঁচা ফল নিয়ে—
তাতে কিছু হয়তো ধরেছিল রঙ, পাক ধরে নি।
      তার পর প্রহরে প্রহরে ফিরেছি পথে পথে;
কত লোক কত বললে, কত নিলে, কত ফিরিয়ে দিলে,
      ভোগ করলে দাম দিলে না সেও কত লোক—
                সেকালের দিন হল সারা।
 
কাল আপন পায়ের চিহ্ন যায় মুছে মুছে,
        স্মৃতির বোঝা আমরাই বা জমাই কেন,
    এক দিনের দায় টানি কেন আর‐এক দিনের ’পরে,
দেনাপাওনা চুকিয়ে দিয়ে হাতে হাতে
    ছুটি নিয়ে যাই‐না কেন সামনের দিকে চেয়ে?
সেদিনকার উদ্‌‍বৃত্ত নিয়ে নূতন কারবার জমবে না
           তা নিলেম মেনে।
      তাতে কী বা আসে যায়!
দিনের পর দিন পৃথিবীর বাসাভাড়া
        দিতে হয় নগদ মিটিয়ে—
        তার পর শেষ দিনে দখলের জোর জানিয়ে
              তালা বন্ধ করবার ব্যর্থ প্রয়াস,
                    কেন সেই মূঢ়তা?
 
         তাই, প্রথম ঘণ্টা বাজল যেই
               বেরিয়েছিলেম হিসেব চুকিয়ে দিয়ে।
         দরজার কাছ পর্যন্ত এসে যখন ফিরে তাকাই
               তখন দেখি, তুমি যে আছ
                  এ কালের আঙিনায় দাঁড়িয়ে।
         তোমার সঙ্গীরা একদিন যখন হেঁকে বলবে
               আর আমাকে নেই প্রয়োজন,
         তখন ব্যথা লাগবে তোমারই মনে
                     এই আমার ছিল ভয়—
               এই আমার ছিল আশা।
         যাচাই করতে আস নি তুমি—
তুমি দিলে গ্রন্থি বেঁধে তোমার কালে আমার কালে হৃদয় দিয়ে।
   দেখলেম ঐ বড়ো বড়ো চোখের দিকে তাকিয়ে,
        করুণ প্রত্যাশা তো এখনো তার পাতায় আছে লেগে।

        তাই ফিরে আসতে হল আর‐একবার।
             দিনের শেষে নতুন পালা আবার করেছি শুরু
                  তোমারই মুখ চেয়ে,
               ভালোবাসার দোহাই মেনে।
        আমার বাণীকে দিলেম সাজ পরিয়ে
                   তোমাদের বাণীর অলংকারে;
        তাকে রেখে দিয়ে গেলেম পথের ধারে পান্থশালায়,
              পথিক বন্ধু, তোমারি কথা মনে ক’রে।
        যেন সময় হলে একদিন বলতে পারো
              মিটল তোমাদেরও প্রয়োজন,
                      লাগল তোমাদেরও মনে।
   দশ জনের খ্যাতির দিকে হাত বাড়াবার দিন নেই আমার।
       কিন্তু, তুমি আমাকে বিশ্বাস করেছিলে প্রাণের টানে।
             সেই বিশ্বাসকে কিছু পাথেয় দিয়ে যাব 
                    এই ইচ্ছা।
 
             যেন গর্ব করে বলতে পার
                   আমি তোমাদেরও বটে,
             এই বেদনা মনে নিয়ে নেমেছি এই কালে—
   এমন সময় পিছন ফিরে দেখি তুমি নেই।
               তুমি গেলে সেইখানেই
   যেখানে আমার পুরোনো কাল অবগুণ্ঠিত মুখে চলে গেল;
            যেখানে পুরাতনের গান রয়েছে চিরন্তন হয়ে।
আর, একলা আমি আজও এই নতুনের ভিড়ে বেড়াই ধাক্কা খেয়ে,
                   যেখানে আজ আছে কাল নেই।
    

১ ভাদ্র ১৩৩৯

খোয়াই

              পশ্চিমে বাগান বন চষা‐ক্ষেত
          মিলে গেছে দূর বনান্তে বেগনি বাষ্পরেখায়;
              মাঝে আম জাম তাল তেঁতুলে ঢাকা
                   সাঁওতাল‐পাড়া;
 পাশ দিয়ে ছায়াহীন দীর্ঘ পথ গেছে বেঁকে
         রাঙা পাড় যেন সবুজ শাড়ির প্রান্তে কুটিল রেখায়।
     হঠাৎ উঠেছে এক‐একটা যূথভ্রষ্ট তালগাছ
 দিশাহারা অনির্দিষ্টকে যেন দিক দেখাবার ব্যাকুলতা।
    পৃথিবীর একটানা সবুজ উত্তরীয়,
        তারই এক ধারে ছেদ পড়েছে উত্তর দিকে,
                 মাটি গেছে ক্ষয়ে,
           দেখা দিয়েছে
    উর্মিল লাল কাঁকরের নিস্তব্ধ তোলপাড়;
মাঝে মাঝে মর্চে‐ধরা কালো মাটি
      মহিষাসুরের মুণ্ড যেন।
পৃথিবী আপনার একটি কোণের প্রাঙ্গণে
       বর্ষাধারার আঘাতে বানিয়েছে
               ছোটো ছোটো অখ্যাত খেলার পাহাড়,
      বয়ে চলেছে তার তলায় তলায় নামহীন খেলার নদী।
 
                 শরৎকালে পশ্চিম আকাশে
                      সূর্যাস্তের ক্ষণিক সমারোহে
                         রঙের সঙ্গে রঙের ঠেলাঠেলি—
    তখন পৃথিবীর এই ধূসর ছেলেমানুষির উপরে
              দেখেছি সেই মহিমা
       যা একদিন পড়েছে আমার চোখে
               দুর্লভ দিনাবসানে
            রোহিতসমুদ্রের তীরে তীরে
       জনশূন্য তরুহীন পর্বতের রক্তবর্ণ শিখরশ্রেণীতে,
               রুষ্টরুদ্রের প্রলয়ভ্রূকুঞ্চনের মতো।

     এই পথে ধেয়ে এসেছে কালবৈশাখীর ঝড়
               গেরুয়া পতাকা উড়িয়ে
       ঘোড়সওয়ার বর্গিসৈন্যের মতো—
        কাঁপিয়ে দিয়েছে শাল সেগুনকে,
             নুইয়ে দিয়েছে ঝাউয়ের মাথা,
          ‘হায়‐হায়’ রব তুলেছে বাঁশের বনে,
        কলাবাগানে করেছে দুঃশাসনের দৌরাত্ম্য।
  ক্রন্দিত আকাশের নীচে ঐ ধূসরবন্ধুর
     কাঁকরের স্তূপগুলো দেখে মনে হয়েছে
         লাল সমুদ্রে তুফান উঠল,
            ছিটকে পড়ছে তার শীকরবিন্দু।
 
  এসেছিনু বালককালে।
       ওখানে গুহাগহ্বরে
            ঝির্ ঝির্ ঝর্নার ধারায়
       রচনা করেছি মন‐গড়া রহস্যকথা,
           খেলেছি নুড়ি সাজিয়ে
       নির্জন দুপুর বেলায় আপন‐মনে একলা।
 
 তার পরে অনেক দিন হল,
     পাথরের উপর নির্ঝরের মতো
          আমার উপর দিয়ে
              বয়ে গেল অনেক বৎসর।
     রচনা করতে বসেছি একটা কাজের রূপ
           ঐ আকাশের তলায় ভাঙামাটির ধারে,
     ছেলেবেলায় যেমন রচনা করেছি
           নুড়ির দুর্গ।
 এই শালবন, এই একলা‐মেজাজের তালগাছ,
         ঐ সবুজ মাঠের সঙ্গে রাঙামাটির মিতালি,
     এর পানে অনেক দিন যাদের সঙ্গে দৃষ্টি মিলিয়েছি,
          যারা মন মিলিয়েছিল
     এখানকার বাদলদিনে আর আমার বাদলগানে,
          তারা কেউ আছে কেউ গেল চলে।
 
 আমারও যখন শেষ হবে দিনের কাজ,
         নিশীথরাত্রের তারা ডাক দেবে
              আকাশের ও পার থেকে—
 তার পরে?
         তার পরে রইবে উত্তর দিকে
                  ঐ বুক‐ফাটা ধরণীর রক্তিমা,
               দক্ষিণ দিকে চাষের ক্ষেত,
        পুব দিকের মাঠে চরবে গোরু,
               রাঙা মাটির রাস্তা বেয়ে
                    গ্রামের লোক যাবে হাট করতে।
       পশ্চিমের আকাশপ্রান্তে
               আঁকা থাকবে একটি নীলাঞ্জনরেখা।
    

৩০ শ্রাবণ ১৩৩৯

পত্র

তোমাকে পাঠালুম আমার লেখা,
        এক‐বই‐ভরা কবিতা।
তারা সবাই ঘেঁষাঘেঁষি দেখা দিল
           একই সঙ্গে এক খাঁচায়।
        কাজেই আর সমস্ত পাবে,
কেবল পাবে না তাদের মাঝখানের ফাঁকগুলোকে।
    যে অবকাশের নীল আকাশের আসরে
        একদিন নামল এসে কবিতা—
           সেইটেই পড়ে রইল পিছনে।

      নিশীথরাত্রের তারাগুলি ছিঁড়ে নিয়ে
            যদি হার গাঁথা যায় ঠেসে,
      বিশ্ববেনের দোকানে
            হয়তো সেটা বিকোয় মোটা দামে—
      তবু রসিকেরা বুঝতে পারে
            যেন কমতি হল কিসের।
      যেটা কম পড়ল সেটা ফাঁকা আকাশ—
           তৌল করা যায় না তাকে,
      কিন্তু সেটা দরদ দিয়ে ভরা।
           মনে করো, একটি গান উঠল জেগে
      নীরব সময়ের বুকের মাঝখানে
           একটি মাত্র নীলকান্তমণি—
            তাকে কি দেখতে হবে
               গয়নার বাক্সের মধ্যে!
            বিক্রমাদিত্যের সভায়
      কবিতা শুনিয়েছেন কবি দিনে দিনে।
            ছাপাখানার দৈত্য তখন
                কবিতার সময়াকাশকে
        দেয় নি লেপে কালী মাখিয়ে।
    হাইড্রলিক জাঁতায়‐পেষা কাব্যপিণ্ড
        তলিয়ে যেত না গলায় এক‐এক গ্রাসে,
    উপভোগটা পুরো অবসরে উঠত রসিয়ে।
 
    হায় রে, কানে শোনার কবিতাকে
      পরানো হল চোখে দেখার শিকল,
কবিতার নির্বাসন হল লাইব্রেরিলোকে;
      নিত্যকালের আদরের ধন
    পাব্লিশরের হাটে হল নাকাল।
           উপায় নেই,
    জটলা‐পাকানোর যুগ এটা।
কবিতাকে পাঠকের অভিসারে যেতে হয়
    পটলডাঙার অম্নিবাসে চ’ড়ে।
      মন বলছে নিশ্বাস ফেলে—
‘আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে’।
    তুমি যদি হতে বিক্রমাদিত্য—
আর, আমি যদি হতেম— কী হবে বলে!
     জন্মেছি ছাপার কালিদাস হয়ে।
         তোমরা আধুনিক মালবিকা,
               কিনে পড় কবিতা
         আরাম‐কেদারায় বসে।
   চোখ বুজে কান পেতে শোন না;
              শোনা হলে
      কবিকে পরিয়ে দাও না বেলফুলের মালা—
           দোকানে পাঁচ শিকে দিয়েই খালাস।
    

১০ ভাদ্র ১৩৩৯

পুকুর-ধারে

       দোতলার জানলা থেকে চোখে পড়ে
               পুকুরের একটি কোণা।
            ভাদ্রমাসে কানায় কানায় জল।
       জলে গাছের গভীর ছায়া টলটল করছে
              সবুজ রেশমের আভায়।
        তীরে তীরে কলমি শাক আর হেলঞ্চ।
       ঢালু পাড়িতে সুপারি গাছক’টা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
এ ধারের ডাঙায় করবী, সাদা রঙন, একটি শিউলি;
     দুটি অযত্নের রজনীগন্ধায় ফুল ধরেছে গরিবের মতো।
বাঁখারি‐বাঁধা মেহেদির বেড়া,
     তার ও পারে কলা পেয়ারা নারকেলের বাগান;
আরো দূরে গাছপালার মধ্যে একটা কোঠাবাড়ির ছাদ,
          উপর থেকে শাড়ি ঝুলছে।
মাথায়‐ভিজে‐চাদর‐জড়ানো গা‐খোলা মোটা মানুষটি
      ছিপ ফেলে বসে আছে বাঁধা ঘাটের পৈঁঠাতে,
           ঘণ্টার পর ঘণ্টা যায় কেটে।
 
বেলা পড়ে এল।
     বৃষ্টি‐ধোওয়া আকাশ,
বিকেলের প্রৌঢ় আলোয় বৈরাগ্যের ম্লানতা।
     ধীরে ধীরে হাওয়া দিয়েছে,
          টলমল করছে পুকুরের জল,
     ঝিল্‌‍মিল্ করছে বাতাবিলেবুর পাতা।
চেয়ে দেখি আর মনে হয়,
      এ যেন আর‐কোনো‐একটা দিনের আবছায়া;
           আধুনিকের বেড়ার ফাঁক দিয়ে
      দূর কালের কার একটি ছবি নিয়ে এল মনে।
স্পর্শ তার করুণ, স্নিগ্ধ তার কণ্ঠ,
      মুগ্ধ সরল তার কালো চোখের দৃষ্টি।
তার সাদা শাড়ির রাঙা চওড়া পাড়
      দুটি পা ঘিরে ঢেকে পড়েছে;
            সে আঙিনাতে আসন বিছিয়ে দেয়,
      সে আঁচল দিয়ে ধুলো দেয় মুছিয়ে;
সে আম‐কাঁঠালের ছায়ায় ছায়ায় জল তুলে আনে,
      তখন দোয়েল ডাকে সজনের ডালে,
           ফিঙে লেজ দুলিয়ে বেড়ায় খেজুরের ঝোপে।
                যখন তার কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসি
      সে ভালো করে কিছুই বলতে পারে না;
কপাট অল্প একটু ফাঁক ক’রে পথের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে,
                  চোখ ঝাপ্‌‍সা হয়ে আসে।
    

২৫ শ্রাবণ ১৩৩৯

অপরাধী

     তুমি বল, তিনু প্রশ্রয় পায় আমার কাছে—
                তাই রাগ কর তুমি।
          ওকে ভালোবাসি,
                তাই ওকে দুষ্টু বলে দেখি,
                     দোষী ব’লে দেখি নে—
                রাগও করি ওর ’পরে
                     ভালোও লাগে ওকে
                          এ কথাটা মিছে নয় হয়তো।

এক‐একজন মানুষ অমন থাকে—
      সে লোক নেহাত মন্দ নয়,
সেইজন্যই সহজে তার মন্দটাই পড়ে ধরা।
        সে হতভাগা রঙে মন্দ, কিন্তু মন্দ নয় রসে;
             তার দোষ স্তূপে বেশি,
                  ভারে বেশি নয়;
        তাই, দেখতে যতটা লাগে
                গায়ে লাগে না তত।
        মনটা ওর হালকা ছিপ্‌‍ছিপে নৌকো,
                হূহু করে চলে যায় ভেসে;
        ভালোই বলো আর মন্দই বলো
                জমতে দেয় না বেশিক্ষণ—
        এ পারের বোঝা ও পারে চালান করে দেয়
                            দেখতে দেখতে—
                    ওকে কিছুই চাপ দেয় না,
                       তেমনি ও দেয় না চাপ।
 
স্বভাব ওর আসর‐জমানো;
            কথা কয় বিস্তর,
তাই, বিস্তর মিছে বলতে হয়—
       নইলে ফাঁক পড়ে কথার ঠাস‐বুনোনিতে।
                মিছেটা নয় ওর মনে,
                        সে ওর ভাষায়—
                ওর ব্যাকরণটা যার জানা
                     তার বুঝতে হয় না দেরি।
ওকে তুমি বল নিন্দুক— তা সত্য।
     সত্যকে বাড়িয়ে তুলে বাঁকিয়ে দিয়ে ও নিন্দে বানায়—
           যার নিন্দে করে তার মন্দ হবে ব’লে নয়,
     যারা নিন্দে শোনে তাদের ভালো লাগবে ব’লে।
           তারা আছে সমস্ত সংসার জুড়ে।
               তারা নিন্দের নীহারিকা—
                   ও হল নিন্দের তারা,
ওর জ্যোতি তাদেরই কাছ থেকে পাওয়া।
    আসল কথা, ওর বুদ্ধি আছে, নেই বিবেচনা।
         তাই, ওর অপরাধ নিয়ে হাসি চলে।
    যারা ভালোমন্দ বিবেচনা করে সূক্ষ্ম তৌলের মাপে
           তাদের দেখে হাসি যায় বন্ধ হয়ে;
                তাদের সঙ্গটা ওজনে হয় ভারী,
                     সয় না বেশিক্ষণ;
           দৈবে তাদের ত্রুটি যদি হয় অসাবধানে,
                     হাঁপ ছেড়ে বাঁচে লোকে।

বুঝিয়ে বলি কাকে বলে অবিবেচনা।—
    মাখন লক্ষ্মীছাড়াটা সংস্কৃতর ক্লাসে
           চৌকিতে লাগিয়ে রেখেছিল ভুষো;
ছাপ লেগেছিল পণ্ডিতমশায়ের জামার পিঠে,
           সে হেসেছিল, সবাই হেসেছিল
               পণ্ডিতমশায় ছাড়া।
হেড্‌‍মাস্টার দিলেন ছেলেটাকে একেবারে তাড়িয়ে;
         তিনি অত্যন্ত গম্ভীর, তিনি অত্যন্ত বিবেচক।
               তাঁর ভাবগতিক দেখে হাসি বন্ধ হয়ে যায়।

               তিনু অপকার করে কিছু না ভেবে,
                   উপকার করে অনায়াসে,
                        কোনোটাই মনে রাখে না।
                ও ধার নেয়, খেয়াল নেই শোধ করবার;
                              যারা ধার নেয় ওর কাছে
                      পাওনার তলব নেই তাদের দরজায়।
                মোটের উপর ওরই লোকসান হয় বেশি।
 
তোমাকে আমি বলি, ওকে গাল দিয়ো যা খুশি,
        আবার হেসো মনে মনে—
               নইলে ভুল হবে।
        আমি ওকে দেখি কাছের থেকে, মানুষ ব’লে,
                   ভালো মন্দ পেরিয়ে।
তুমি দেখ দূরে ব’সে, বিশেষণের কাঠগড়ায় ওকে খাড়া রেখে।
        আমি ওকে লাঞ্ছনা দিই তোমার চেয়ে বেশি—
             ক্ষমা করি তোমার চেয়ে বড়ো ক’রে।
                   সাজা দিই, নির্বাসন দিই নে।
        ও আমার কাছেই রয়ে গেল,
                      রাগ কোরো না তাই নিয়ে।
    

৭ ভাদ্র ১৩৩৯

পত্রলেখা

  দিলে তুমি সোনা‐মোড়া ফাউণ্টেন পেন,
       কতমতো লেখার আসবাব।
             ছোটো ডেস্‌‍কোখানি।
                  আখরোট কাঠ দিয়ে গড়া।
  ছাপ‐মারা চিঠির কাগজ
         নানা বহরের।
  রুপোর কাগজ‐কাটা এনামেল‐করা।
              কাঁচি, ছুরি, গালা, লাল ফিতে।
                  কাঁচের কাগজ‐চাপা,
              লাল নীল সবুজ পেন্‌‍সিল।
  বলে গিয়েছিলে তুমি, চিঠি লেখা চাই
                       একদিন পরে পরে।
 
              লিখতে বসেছি চিঠি,
         সকালেই স্নান হয়ে গেছে।
লিখি যে কী কথা নিয়ে কিছুতেই ভেবে পাই নে তো।
         একটি খবর আছে শুধু—
               তুমি চলে গেছ।
         সে খবর তোমারও তো জানা।
               তবু মনে হয়,
         ভালো করে তুমি সে জান না।
     তাই ভাবি, এ কথাটি জানাই তোমাকে—
               তুমি চলে গেছ।
           যতবার লেখা শুরু করি
   ততবার ধরা পড়ে, এ খবর সহজ তো নয়।
                আমি নই কবি—
     ভাষার ভিতরে আমি কণ্ঠস্বর পারি নে তো দিতে,
           না থাকে চোখের চাওয়া।
                যত লিখি তত ছিঁড়ে ফেলি।
 
   দশটা তো বেজে গেল।
         তোমার ভাইপো বকু যাবে ইস্‌‍কুলে,
              যাই তারে খাইয়ে আসিগে।
                   শেষবার এই লিখে যাই—
                       তুমি চলে গেছ।
                   বাকি আর যতকিছু
              হিজিবিজি আঁকাজোকা ব্লটিঙের ’পরে।
    

১৪ আষাঢ় ১৩৩৯

ছুটির আয়োজন

কাছে এল পূজার ছুটি।
     রোদ্‌‍দুরে লেগেছে চাঁপাফুলের রঙ।
        হাওয়া উঠছে শিশিরে শির্‌‍শিরিয়ে,
          শিউলির গন্ধ এসে লাগে
    যেন কার ঠাণ্ডা হাতের কোমল সেবা।
          আকাশের কোণে কোণে
                সাদা মেঘের আলস্য,
              দেখে মন লাগে না কাজে।

মাস্টারমশায় পড়িয়ে চলেন
            পাথুরে কয়লার আদিম কথা।
        ছেলেটা বেঞ্চিতে পা দোলায়,
              ছবি দেখে আপন‐মনে—
        কমলদিঘির ফাটল‐ধরা ঘাট,
              আর ভঞ্জদের পাঁচিল‐ঘেঁষা
                    আতাগাছের ফলে‐ভরা ডাল।
আর দেখে সে মনে মনে, তিসির ক্ষেতে
        গোয়ালপাড়ার ভিতর দিয়ে
           রাস্তা গেছে এঁকেবেঁকে হাটের পাশে
               নদীর ধারে।
 
         কলেজের ইকনমিক্‌‍স্‌‍‐ক্লাসে
              খাতায় ফর্দ নিচ্ছে টুকে
              চশমা‐চোখে মেডেল‐পাওয়া ছাত্র—
         হালের লেখা কোন্ উপন্যাস কিনতে হবে,
     ধারে মিলবে কোন্ দোকানে
‘মনে‐রেখো’ পাড়ের শাড়ি,
       সোনায়‐জড়ানো শাঁখা,
দিল্লির‐কাজ‐করা লাল মখমলের চটি।
     আর চাই রেশমে‐বাঁধাই‐করা
           অ্যান্টিক কাগজে ছাপা কবিতার বই,
                 এখনো তার নাম মনে পড়ছে না।
 
ভবানীপুরের তেতালা বাড়িতে
     আলাপ চলছে সরু মোটা গলায়—
          এবার আবু পাহাড় না মাদুরা,
              না ড্যাল্‌‍হৌসি কিম্বা পুরী
     না সেই চিরকেলে চেনা লোকের দার্জিলিঙ?
 
         আর দেখছি সামনে দিয়ে
      স্টেশনে যাবার রাঙা রাস্তায়
শহরের‐দাদন‐দেওয়া দড়িবাঁধা ছাগল‐ছানা
         পাঁচটা ছটা ক’রে—
      তাদের নিষ্ফল কান্নার স্বর ছড়িয়ে পড়ে
কাশের‐ঝালর‐দোলা শরতের শান্ত আকাশে।
          কেমন ক’রে বুঝেছে তারা
                এল তাদের পূজার ছুটির দিন।
    

১৭ ভাদ্র ১৩৩৯